শনিবার, ২৫ Jun ২০২২, ১১:১৩ পূর্বাহ্ন

দৃষ্টি দিন:
সম্মানিত পাঠক, আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। প্রতিমুহূর্তের সংবাদ জানতে ভিজিট করুন -www.coxsbazarvoice.com, আর নতুন নতুন ভিডিও পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল Cox's Bazar Voice. ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন এবং কমেন্ট করুন। ধন্যবাদ।

আত্মোপলব্ধির প্রয়োজনীয়তা

ইসলাম। ফাইল ছবি।

মুফতি এনায়েতুল্লাহ:
দুনিয়ার যাবতীয় সৃষ্টির মধ্যে যেসব গুণের সন্ধান পাওয়া যায়, তার প্রত্যেকটিরই উৎস ও উৎপত্তিস্থল মহান আল্লাহর কোনো না কোনো গুণ। এ প্রসঙ্গে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, মহান আল্লাহ রহমতকে একশ’ ভাগে বিভক্ত করেছেন। তার মধ্যে নিরানব্বই ভাগ তিনি নিজের কাছে সংরক্ষিত রেখেছেন। আর পৃথিবীতে একভাগ পাঠিয়েছেন। ওই এক ভাগ পাওয়ার কারণেই সৃষ্টি জগৎ পরস্পরের প্রতি দয়া করে। এমনকি ঘোড়া তার বাচ্চার ওপর থেকে পা উঠিয়ে নেয় এই আশঙ্কায় যে, সে ব্যাথা পাবে।’ -সহিহ বোখারি : ৬০০০

বলা হয়, ‘যে নিজেকে চিনল, সে তার প্রভুকে চিনল।’ নিজেকে চেনা ও জানা প্রতিটি মানুষের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। নিজেকে চেনার বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে- আমি কে, কী আমার পরিচয়, আমাকে কে সৃষ্টি করেছেন, কেন আমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে, আমাকে কেন দুনিয়ায় পাঠানো হয়েছে, এই পৃথিবীতে আমার দায়িত্ব ও কর্তব্য কী, আমার শেষ গন্তব্য ও পরিণতি কোথায়, চূড়ান্ত গন্তব্যের জন্য কতটুকু পাথেয় সংগ্রহ করেছি, কবর থেকে শুরু করে হাশরের ময়দানের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে মহান রবের সামনে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর জন্য আমি কতটুকু প্রস্তুত? এভাবে কোনো মানুষ যদি আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নিজেকে আবিষ্কার করে, নিজের অবস্থান যাচাই করে এবং নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হয় তাহলে তার দ্বারা অকল্যাণমূলক, ধ্বংসাত্মক কোনো কাজ সংঘটিত হবে না। কারণ আত্মোপলব্ধি মানুষকে আল্লাহর পথে পরিচালিত করতে এবং আখেরাতমুখী হতে সাহায্য করে। মানুষের উন্নয়ন ও অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হচ্ছে আরও ভালোভাবে বেঁচে থাকার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। নিজেকে চেনার মাধ্যমে এই ক্ষেত্র প্রস্তুত সহজতর হয়। কারণ এর মাধ্যমে নিজের শক্তি, সামর্থ্য, দুর্বলতা, চাহিদা, আগ্রহ, ভীতি ও প্রত্যাশা সম্পর্কে নিজের মধ্যে সুস্পষ্ট উপলব্ধি ও ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মধ্য দিয়ে আমরা নিজের ভেতরে থাকা কুঅভ্যাস ও কুচিন্তার সঙ্গে পরিচিত হতে পারি।

তবে নিজেকে চিনতে হলে কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করতেই হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। প্রথম পদক্ষেপ হলো, আপনাকে জানতে হবে কোন কোন বিষয় ও জিনিস আপনাকে বেশি টানে অর্থাৎ কোন বিষয়গুলোর প্রতি আপনার আগ্রহ বেশি। চেষ্টা করুন, আপনার আবেগ-উচ্ছ্বাস, বিনোদনসহ যা কিছু আপনাকে আকৃষ্ট করে তা চিহ্নিত করার। বেশিরভাগ মানুষই পছন্দনীয় ক্ষেত্রে কাজ করাকে প্রাধান্য দেয়। আপনি নিজের আগ্রহের জায়গা সম্পর্কে যত বেশি অবহিত হতে পারবেন তত বেশি সুন্দরভাবে জীবনকে সাজাতে পারবেন এবং চাকরি ও শিক্ষা ক্ষেত্রেও সাফল্য অর্জনে সক্ষম হবেন।

পরবর্তী পদক্ষেপ হলো, মূল্যবোধ নির্ধারণ। মূল্যবোধ একটি মানদণ্ড, যা মনোভাবের ভিত্তিতে গঠিত অপেক্ষাকৃত স্থায়ী বিশ্বাস। মূল্যবোধগুলো আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সঠিক পথে চলার পথে উৎসাহ জোগায়। একইভাবে আমাদের কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহায়তা করে। যেকোনো লক্ষ্যে পৌঁছাতে কিছু কষ্ট সহ্য করতে হয়। এই কষ্ট সহ্য করার শক্তি জোগায় মূল্যবোধ। আপনি যখন নিজের বৈশিষ্ট্যগুলো সম্পর্কে অবহিত হন, তখন নিজের প্রতিভাকে সহজেই আরও বেশি প্রস্ফুটিত করার সুযোগ পান। নিজের ব্যক্তিত্বকে চিনতে পারলে সহজেই নিজের ভালো দিকগুলোকে শাণিত করা সম্ভব হয় এবং নিজের দুর্বলতাকে সহজেই কাটিয়ে ওঠা যায়। নিজের শক্তি ও সামর্থ্য সম্পর্কে জানার ফলে বেশি বেশি সাফল্য অর্জন করা যায়, কারণ কোনো মানুষই ত্রুটিমুক্ত নন, পরিপূর্ণতাও শতভাগ নয়।

আমরা অন্যের সমালোচনা করতে খুবই পটু হলেও নিজের দোষ-ত্রুটিগুলো চোখে পড়ে না। নিজেকে চিনতে পারার ফলে আমরা নিজেদের দোষ-ত্রুটিগুলোকে সঠিকভাবে বুঝতে পারি এবং আমরা জানতে পারি অন্যদের মতো আমরাও ত্রুটিমুক্ত নই। নিজেকে চেনার তৃতীয় পদক্ষেপ হলো লক্ষ্য নির্ধারণ। সঠিক নীতি ও বাস্তবতার আলোকে লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারার গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা যখন লক্ষ্য নির্ধারণে ভুল করি অথবা অবাস্তব স্বপ্ন দেখতে থাকি তখন আমরা ভুলপথে এগোতে থাকি এবং এক সময় আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলি।

আত্মপরিচিতি মানুষকে সঠিক চিন্তা-বিশ্বাসের ভিত্তিতে লক্ষ্য নির্ধারণের পথ দেখায়। অন্যভাবে বলা যায়, মানুষ নিজের শক্তি ও দুর্বলতার আলোকে লক্ষ্য নির্ধারণ করে। এমতাবস্থায় আরেকটি বিষয়ে অবশ্যই মনোযোগ দেবেন তাহলো নিজের জীবনযাপনের পদ্ধতি সম্পর্কে অবহিত হওয়ার চেষ্টা করা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, খেয়াল করবেন রাত-দিনের কোন সময়টায় আপনি কাজ-কর্মে বেশি উৎসাহবোধ করেন এবং বেশি কাজ করতে পারেন। যেসব বিষয় আপনার ওপর প্রভাব ফেলে সেগুলোকে চিহ্নিত করুন। এসব বিষয় আপনাকে লক্ষ্যে পৌঁছাতে সহযোগিতা করবে।

আত্মপরিচিতির অনেক উপকারী দিক রয়েছে। এসবের মধ্যে একটি হলো- সুখানুভূতি। নিজেকে চেনার ফলে লক্ষ্য অর্জনের পথটি আপনার কাছে অনেক মসৃণ ও সহজ মনে হবে। কারণ আপনি জানেন কী করছেন, কেন করছেন। আপনার আবেগ-উচ্ছ্বাস, বিশ্বাস ও মূল্যবোধের সঙ্গে আপনার প্রত্যাশা অসামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না। কাজেই আপনার জীবনে আরও বেশি প্রশান্তি আসবে। আপনি নিজের শক্তি-সামর্থ্য ও দুর্বলতা সম্পর্কে জানার পর যখন পথ চলবেন তখন আপনি পা ফেলবেন হিসাব-নিকাশ করে, কারণ আপনি আপনার সীমা ও পরিধি সম্পর্কে অবহিত, আপনি যে জীবন-কাঠামো গড়ে তুলেছেন তা বাস্তবভিত্তিক। আত্মপরিচিতি আপনাকে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করবে। আপনি যখন নিজের শক্তি ও দুর্বলতা সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে যাবেন তখন স্বাভাবিকভাবেই দুর্বলতা দূর করতে সচেষ্ট হবেন এবং শক্তি ও সামর্থ্যকে আরও বাড়াতে চাইবেন। এটাই সব সময় করা উচিত। নিজের দুর্বলতা দূর করার চেষ্টার মধ্যদিয়ে খারাপ অভ্যাসগুলো দূর করা সম্ভব হবে যা জীবনকে আরও সুন্দর করে তুলবে।

পবিত্র কোরআনের দৃষ্টিতে আত্মপরিচিতি সরাসরি মানুষের বোধ, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বুদ্ধি, বিবেক এবং মেধার সঙ্গে সম্পৃক্ত। নিজের সম্পর্কে মানুষ যত বেশি জানবে, মানুষের চিন্তার গভীরতা তত বাড়বে। আর এটাই জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা ও সাফল্য।

লেখক : শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক লেখক

ভয়েস/আআ

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020
Design & Developed BY jmitsolution.com