মঙ্গলবার, ০৪ অক্টোবর ২০২২, ০৩:৩৯ অপরাহ্ন

দৃষ্টি দিন:
সম্মানিত পাঠক, আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। প্রতিমুহূর্তের সংবাদ জানতে ভিজিট করুন -www.coxsbazarvoice.com, আর নতুন নতুন ভিডিও পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল Cox's Bazar Voice. ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন এবং কমেন্ট করুন। ধন্যবাদ।

কক্সবাজার পুলিশ সুপার কার্যালয়ের সামনে গণপূর্তের জমিতে মার্কেট নির্মাণ!

আবদুল আজিজ:
কক্সবাজারে গণপূর্তের জমিতে প্রথমে মসজিদ নির্মাণের ব্যানার টাঙ্গিয়ে ভবণ নির্মাণের কাজ শুরু করেন কক্সবাজার জেলা কালেক্টরেট চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারি সমিতি। পরে ভবণের নির্মাণ কাজ শেষ হলে সেই ব্যানার উঠিয়ে করা হয় মার্কেট। বর্তমানে ১১টি কক্ষে খোলা হয়েছে মার্কেট। রাখা হয়নি মসজিদের জন্য কোন স্থান।

দীর্ঘ ৬ মাস ধরে প্রশাসনের নাকের ডগায় এ মার্কেট নির্মাণ করা হলেও কার্যত কোন ধরণের ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কক্সবাজার শহরের পুলিশ সুপার কার্যালয়ের দেয়াল ঘেষে শহীদ স্মরণীতে গড়ে তোলা হয় মার্কেটটি। মার্কেটটি নির্মাণের সময় মসজিদের ব্যানার টাঙ্গিয়ে ব্যাক্তি বিশেষের কাজ থেকে মোটা অংকের টাকাও উত্তোলন করা হয়। কিন্তু, ভবণ নির্মাণ যখন শেষ পর্যায়ে তখন উধাও হয়ে যায় ব্যানারটি। একইভাবে আত্মসাত করা হয় মসজিদের জন্য উত্তেলিত টাকাও।

গত ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে কক্সবাজার গণপূর্ত বিভাগের সংশ্লিষ্টরা কক্সবাজার সদর থানায় জিডি’র পাশাপাশি কক্সবাজার জেলা প্রশাসক ও কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) চেয়ারম্যান বরাবরে লিখিত অভিযোগ দিয়ে দায় ছেড়েছেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত কোন ধরণের ব্যবস্থা নেয়নি।

সর্বশেষ চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারী দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কক্সবাজার জেলা সমন্বিত কার্যালয়ের এনফোর্সমেন্ট ইউনিটের একটি দল অভিযান চালিয়ে ঘটনার সত্যতা পায়। পরে দলটির নেতৃত্ব দানকারি দুদকের সহকারি পরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন প্রধান কার্যালয়ে সরকারি জমি উদ্ধারে সুপারিশ করে একটি প্রতিবেদন প্রেরণ। তবে দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোন ধরণের নির্দেশনা আসেনি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

গণপূর্ত বিভাগের সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য মতে, কক্সবাজার শহরের শহীদ সরণিস্থ জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের সামনে রাস্তার পাশে গণপূর্ত বিভাগের মালিকানাধীন ৭ শতক জমি রয়েছে। ওই জমি গত ২০ বছর ধরে অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে জেলা কালেক্টরেট চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারি সমিতি।

গত বছর নভেম্বর মাসে দখলকৃত ওই জায়গায় চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারি সমিতি পাকা স্থাপনার বহুতল ভবন নির্মাণকাজ শুরু করলে গণপূর্ত বিভাগ আপত্তি জানায়। এখন সেখানে পাকা স্থাপনার মার্কেট নির্মাণ করে বিভিন্ন লোকজনের নিকট দোকান ভাড়া দিয়েছে। আর প্রতিটি দোকান ভাড়ার চুক্তি বাবদ প্রতিজনের কাছ থেকে আদায় করা হয়েছে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা।

এ নিয়ে গণপূর্ত বিভাগ কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ শাহজাহান এর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে বিষয়টির ব্যাপারে অবগত নন বলে জানান। তবে এ ব্যাপারে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আরিফুর রহমানের সঙ্গে কথা বলতে পরামর্শ দেন তিনি।

বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে আরিফুর রহমান কক্সবাজার ভয়েসকে বলেন, কক্সবাজার শহরে জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের পাশে গণপূর্ত বিভাগের মালিকানাধীন কিছু পরিমান জায়গা দীর্ঘ বছর ধরে অবৈধভাবে ভোগদখলে রেখেছে জেলা কালেক্টরেট চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারি সমিতি। গত বছর নভেম্বর মাসে সমিতির উদ্যোগে সেখানে পাকা স্থাপনার বহুতল ভবন নির্মাণকাজ শুরু করে।

বিষয়টি নজরে এলে গণপূর্ত বিভাগ আপত্তি জানায়। কিন্তু চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারি সমিতি আপত্তি অমান্য করে বহুতল ভবনের পাকা স্থাপনা নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখে।

তিনি আরও কক্সবাজার ভয়েসকে বলেন, “গত বছর ৩০ নভেম্বর আমি বাদী হয়ে কক্সবাজার সদর থানায় অবৈধভাবে সরকারি জায়গা দখলের অভিযোগে সমিতির বিরুদ্ধে একটি জিডি করেছি। এরপর জায়গা থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ পূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসক ও কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বরাবরে লিখিত আবেদন করেছি।”

গণপূর্ত বিভাগের এ কর্মকর্তা কক্সবাজার ভয়েসকে বলেন, ” ইতিমধ্যে দখলকৃত জায়গায় বহুতল ভবনের এক তলা পাকা স্থাপনার মার্কেট নির্মাণকাজ শেষ করেছে জেলা চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারি সমিতি। মার্কেটে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে নির্মিত দোকান ঘর বিভিন্ন লোকজনের কাছে ভাড়াও দিয়েছে। অথচ অভিযোগ জানানোর অন্তত ৭ মাস পেরিয়ে গেলেও জেলা প্রশাসন ও কউক কর্তৃপক্ষ কোন ধরণের ব্যবস্থা নেয়নি। এমন কি থানা পুলিশও ঘটনার ব্যাপারে কোন ধরণের প্রতিবেদন দেননি।”

সচেতন মহল ও স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গণপূর্ত বিভাগের মালিকাধীন সরকারি মূল্যবান জায়গা দখলে নিতে জেলা কালেক্টরেট চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারি সমিতি বহুতল ভবন নির্মাণে অভিনব প্রতারণার আশ্রয় নেয়। ভবনটির নির্মাণকাজ শুরুর আগে সমিতির উদ্যোগে বিরোধীয় জায়গায় ‘মসজিদ স্থাপনের’ ব্যানার সাটাই করে। এমন কি সমিতির দায়িত্বরতরা মসজিদ নির্মাণের নামে স্থানীয় বিশিষ্টজনের কাছ থেকে অনুদানের নগদ টাকাও সংগ্রহ করেছে। কিন্তু সরকারি ওই জায়গায় মসজিদ স্থাপিত না হলেও নির্মিত হয়েছে বাণ্যিজিক ভবনের মার্কেট। এখন ওই মার্কেটের দোকানগুলো মোটা অংকের টাকায় চুক্তি করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এটি মসজিদের নামে এটি এক ধরণের ধর্ম অবমাননা।

গত বছরখানেক আগে সমিতির উদ্যোগে প্রস্তাবিত কথিত মসজিদের জন্য অনুদান প্রদানকারি স্থানীয় সমাজকর্মী সরওয়ার আলম বলেন, জেলা চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারি সমিতির দায়িত্বরতরা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের পাশের জায়গায় একটি মসজিদ নির্মাণের জন্য তার কাছে অনুদানের সহায়তা চান। তিনি প্রাথমিকভাবে অনুদান বাবদ ১০ হাজার টাকা প্রদান করেন। কিন্তু, পরে জানতে পারি, মসজিদ নির্মাণের জন্য প্রস্তাবিত জায়গাটি গণপূর্ত বিভাগের মালিকাধীন। আর জায়গার মালিকানা নিয়ে সমিতির সঙ্গে গণপূর্ত বিভাগের বিরোধ রয়েছে। মূলতঃ বানিজ্যিক ভবন নির্মাণের জন্য মসজিদ স্থাপনের প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে প্রতারণার উদ্দ্যেশে।”

প্রস্তাবিত কথিত মসজিদে অনুদান দেওয়া এ সমাজকর্মী সরওয়ার আলম আরও বলেন, “জেলা চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারি সমিতি মসজিদ নির্মাণের প্রস্তাবনা দিয়েছে আরও অনেকের কাছ থেকে অনুদান সংগ্রহ করেছেন। প্রস্তাবিত মসজিদের জায়গায় এখন নির্মিত হয়েছে বাণিজ্যিক ভবন। আর সমিতির দায়িত্বরতরা মসজিদ নির্মাণের নাম করে বিভিন্নজনের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা আদায় করেছে আত্মসাত করেছে। মসজিদ স্থাপনের প্রস্তাবনাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বাণ্যিজিক ভবননির্মাণ এবং অনুদান সংগ্রহ করে আত্মসাতের বিষয়টি খুবই দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন সরওয়ার আলম।”

এদিকে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারী সরকারি মূল্যবান জায়গা দখল করে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের অভিযোগে দুদকের কক্সবাজার জেলা সমন্বিত কার্যালয়ের তদন্ত করে সত্যতা পায় কর্মকর্তা মো: রিয়াজ উদ্দিন।

এ নিয়ে রিয়াজ উদ্দিন কক্সবাজার ভয়েসকে বলেন, কক্সবাজার শহরে পুলিশ সুপার কার্যালয় সংলগ্ন এলাকায় জেলা চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারি সমিতির উদ্যোগে সরকারি জায়গা দখল করে বাণিজ্যিক বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগে দুদকের একটি দল অভিযান চালিয়েছিল। এতে অভিনব প্রতারণার মাধ্যমে জায়গা দখলের অভিযোগের সত্যতা পায়। এর পরপরই জেলা চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারি সমিতির উদ্যোগে নির্মিত ও নির্মাণাধীন সবধরণের স্থাপনা উচ্ছেদ করে সরকারি জায়গা উদ্ধারে ব্যবস্থা প্রহণের জন্য দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সুপারিশ আকারে একটি প্রতিবেদন প্রেরণ করা হয়েছিল। কিন্তু, প্রতিবেদন পাঠানোর প্রায় ৭ মাস অতিক্রান্ত হলেও দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে এখন পর্যন্ত কোন ধরণের নির্দেশনা পাননি বলেন দুদকের এ সহকারি পরিচালক।”

অভিযোগের ব্যাপারে কক্সবাজার জেলা কালেক্টরেট চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারি সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম গনমাধ্যমকে বলেন, অভিযোগের ব্যাপারে তিনি কোনভাবেই জড়িত নন। প্রস্তাবিত মসজিদ ও মার্কেট নির্মাণের জন্য সমিতির উদ্যোগে সভাপতি সহ পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি রয়েছে।

সমিতির ওই কমিটির সদস্যরাই এ ব্যাপারে অভিযোগের ব্যাপারে সত্যতা ভাল বলতে পারেন বলে জানান কর্মচারি সমিতির এ কর্মকর্তা। তবে অভিযোগের ব্যাপারে সমিতির সভাপতির সঙ্গে কথা বলতে প্রতিবেদককে পরামর্শ দেন আবুল হাশেম।

এ বিষয়ে যোগাযোগ হলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আমিন আল পারভেজ কক্সবাজার ভয়েসকে বলেন, “যেহেতু কালেক্টরেট চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারি কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের, সেহেতু বিষয়টি আমাদের উপর বর্তায়। এজন্য আমি নিজে গিয়ে ভবণ নির্মাণ না করতে নিষেধ করেছি। আমি তাদের (কালেক্টরেট চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী) পরিস্কার করে বলে দিয়েছি জমিটি গণপূর্ত বিভাগের। গণপূর্ত অনুমতি ছাড়া কোন ধরণের বন্দোবস্তিও দেয়া যাবে না। বন্দোবস্তি পেতে হলে গণপূর্তের লিখিত অনুমতি লাগবে।”

তিনি আরও বলেন, “গণপূর্ত বিভাগের জমিতে ভবণ নির্মাণের বিষয়টি একান্ত গণপূর্ত বিভাগ দেখভার করবেন। এতে অনর্থক কক্সবাজার জেলা প্রশাসন দায় নেবে না।”

ভয়েস/আআ

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020
Design & Developed BY jmitsolution.com