শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:৪০ অপরাহ্ন

দৃষ্টি দিন:
সম্মানিত পাঠক, আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। প্রতিমুহূর্তের সংবাদ জানতে ভিজিট করুন -www.coxsbazarvoice.com, আর নতুন নতুন ভিডিও পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল Cox's Bazar Voice. ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন এবং কমেন্ট করুন। ধন্যবাদ।

কাতার বিশ্বকাপই কি সেই স্বপ্নপূরণের মঞ্চ?

নেইমার

ভয়েস নিউজ ডেস্ক:

‘আমার নিজের আনন্দের জন্য আমি ওকে শাস্তি দিইনি। ওর জন্যই এটা দরকার ছিল’—সান্তোসের বোর্ড সভায় নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ঠিক এই কথাটাই বলেছিলেন কোচ দরিভাল জুনিয়র।

ঘটনাটা ২০১০ সেপ্টেম্বরের। যাঁকে শাস্তি দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা দিতে কোচ দরিভালকে সান্তোসের বোর্ড সভায় হাজির হতে হয়েছিল, সেই ছেলেটার নাম নেইমার।

শাস্তির কারণ, আতলেতিকো গুইয়ানিয়েন্সের বিপক্ষে একটা ম্যাচে পেনাল্টি নিতে না দেওয়ায় নেইমার কোচ দরিভালের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছিলেন। ম্যাচে হাতাহাতি হয়েছিল প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের সঙ্গেও। সেই ‘খারাপ আচরণের’ কিছুটা টেলিভিশনেই দেখেছিলেন দর্শক। তবে সে সময় ব্রাজিলিয়ান সংবাদমাধ্যম লিখেছিল, ম্যাচ শেষে ড্রেসিংরুমেও নাকি দরিভালকে যা-তা ভাষায় গালমন্দ করেছিলেন নেইমার। গুইয়ানিয়েন্সের কোচ রেনে সিমোস ম্যাচটা শেষে সংবাদমাধ্যমে বলেছিলেন, ‘আমি এত বছর ধরে ব্রাজিলে কোচিং করাই, কোনো ছেলেকে এতটা অসদাচরণ করতে দেখিনি। ওর (নেইমার) খেলোয়াড়ি শিক্ষা বলতে গেলে নেই-ই। কারও উচিত ছেলেটাকে কিছুটা শিষ্টাচার শেখানো, নইলে দেখা যাবে ব্রাজিল ফুটবলে একটা দানব তৈরি হয়েছে।’ ওই ম্যাচের পরেই নেইমারকে পরের ম্যাচ থেকে বাদ দেওয়ার ঘোষণা দেন দরিভাল, তাঁর মাসিক বেতনের এক-তৃতীয়াংশ জরিমানাও করেন।

এরপর সেই বোর্ড সভা এবং যে সভার ২৪ ঘণ্টা পর, ২১ সেপ্টেম্বর দেখা গেল দরিভাল বাক্স-পেটরা গুছিয়ে সান্তোস থেকে বিদায় নিচ্ছেন। ১৮ বছর বয়সী এক উঠতি ফুটবলারের সঙ্গে কোচের দ্বন্দ্বে সান্তোস বোর্ড পক্ষ নিল সেই ফুটবলারের। চাকরি হারালেন ৯ মাসের মধ্যে সান্তোসকে ব্রাজিলিয়ান ঘরোয়া ফুটবলের অন্যতম বড় দুটি ট্রফি ও শতকরা প্রায় ৬৫ ভাগ ম্যাচ জেতানো কোচ। বার্তাটা ছিল পরিষ্কার—নেইমার যে কারও চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সেই ১৮ বছর বয়স থেকে শুরু করে এই ৩০ পর্যন্ত—নেইমারের বর্ণিল ক্যারিয়ারের গল্প আসলে প্রায় একই আছে। জাতীয় দল ব্রাজিল হোক কিংবা ক্লাব ফুটবল, তিনি প্রায় সব সময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯ বছর বয়সে ব্রাজিলের হয়ে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে একটা ম্যাচে ফাউল আদায় করতে ডাইভ দেওয়ার পর স্কটিশ সমর্থকদের দুয়ো শুনেছিলেন নেইমার। সেটা নিয়ে স্কটিশ ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে রীতিমতো লেগে গিয়েছিল ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের। ২১ বছর বয়সে তাঁকে কিনতে দলবদলের বাজারে রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে বার্সেলোনার মহাযুদ্ধ, শেষ পর্যন্ত নানা কৌশল (অনেকে বলেন ‘অনিয়ম’) করে বার্সেলোনার জয়—এখানেও তিনি আলাদা। গত কয়েক দশকের মধ্যে আর কোনো ফুটবলারের দলবদল নিয়ে কি এমন বছরের পর বছর ধরে মামলা চলেছে! আবার সেই নেইমারই বার্সেলোনায় মেসির ছায়াতলে থাকতে চাননি বলে চার বছর পর দলবদলের ইতিহাসে যাবতীয় রেকর্ড ভেঙে পাড়ি জমিয়েছেন পিএসজিতে। এর চেয়েও বিস্ময়কর লেগেছে, যখন খবর এল, এভাবে চলে যাওয়ার পরও তাঁকে ফেরানোর জন্য বার্সেলোনা নাকি বেশ চেষ্টাচরিত্র করছে! সবকিছুর কারণ তো একটাই—নেইমার খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এই যে সব সময় এমন গুরুত্ব পাওয়া, এর মধ্যে একধরনের আনন্দ তো অবশ্যই আছে, আছে একটা ভয়ও। এটাকে প্রেরণা হিসেবে নিলে ফলাফলটা চমৎকার হতে পারে, তবে তা মাথায় চলে গেলে কঠিন হয়ে যেতে পারে চলার পথ।

নেইমার এই গুরুত্বটা পেয়ে আসছেন একেবারে ছোটবেলা থেকে। বয়স ছয় হওয়ার আগেই তিনি ফুটসালে স্কুল দলের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত খেলোয়াড়, ১১ হওয়ার আগেই পর্তুগিজা সান্তিস্তার হয়ে প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে অভিষেক, ১৪ হওয়ার আগেই রিয়াল মাদ্রিদের বয়সভিত্তিক দলের ট্রায়ালে টিকে থেকে যাওয়ার প্রস্তাব, ১৭-তে সান্তোসের সঙ্গে লাখ টাকার পেশাদার চুক্তি, ১৯ বছর বয়সে ফিফা পুসকাস পুরস্কার, ২০ পেরোনোর আগেই ব্রাজিলের মহাসড়কগুলোর পাশের বিলবোর্ড আর টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনে শুধু তাঁর মুখ, ডিওডরেন্ট থেকে শুরু করে বিলাসী গাড়ির পণ্যদূত, দুবার দক্ষিণ আমেরিকার সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার এবং ২১ হওয়ার আগেই তিনি বিশ্ব ফুটবলে সমকালের সবচেয়ে বড় তিন তারকার একজন। ভাবা যায়, তখনো নেইমারকে ইউরোপের ফুটবল দেখেইনি, ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপ তো দূরের কথা কোপা কিংবা কনফেডারেশন কাপও খেলেননি! তাঁর আগের প্রজন্ম কিংবা পরের প্রজন্মের ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারদের কেউই সম্ভবত এত দ্রুত বিশ্ব ফুটবলের মহাতারকা হয়ে উঠতে পারেননি।

নেইমার এর কোনোটার যোগ্য ছিলেন না—এটা তাঁর কঠোর সমালোচকেরাও বলবেন না। নতুন কোনো প্রতিভা পেলেই নিয়ম মেনে তাঁর মধ্যে কিংবদন্তি পেলেকে খোঁজেন ব্রাজিলিয়ান ফুটবলপ্রেমীরা, নেইমারের মধ্যেও তা খোঁজা শুরু হয়ে গিয়েছিল তাঁর কৈশোর পেরোনোর আগেই। কারও কারও চোখে তো তিনি ছিলেন পেলে-গারিঞ্চার মিলিত আধুনিক সংস্করণ! তাঁর ড্রিবলিং দেখার মতো, বল পায়ে দারুণ গতিময়, খেলতে পারেন দুই পায়েই, বাতাসে থাকা বলে চমৎকার, মাঠে যা-ই করেন—হোক সেটা ছোট কোনো পাস কিংবা ডামি, মনে হয় ওটাই ওই সময়ের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য। তাঁর মধ্যে তাই পেলেকে খোঁজার চেষ্টাটা মোটেও অকারণ ছিল না। নেইমার কবে ব্রাজিল দলে খেলবেন, এই অপেক্ষা তাই শুরু হয়েছিল তিনি যখন সান্তোসের বয়সভিত্তিক দলে, তখন থেকেই।

দক্ষিণ আফ্রিকায় ২০১০ বিশ্বকাপে ব্রাজিল দলে ১৮ বছর বয়সী নেইমারকে রাখার জন্য তখনকার কোচ কার্লোস দুঙ্গার কাছে ১৪ হাজার লোকের সইসহ একটা দরখাস্ত জমা পড়েছিল, অনুরোধ এসেছিল খোদ পেলে ও রোমারিওর কাছ থেকে! দুঙ্গা সেই অনুরোধ রাখেননি এই যুক্তিতে যে যাঁর ব্রাজিলের হয়ে অভিষেকই হয়নি, তাঁকে সরাসরি বিশ্বকাপের মঞ্চে নামিয়ে দেওয়াটা ঝুঁকি হয়ে যাবে।

ওই বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালেই ব্রাজিলের যাত্রা থেমে যাওয়ার পর পত্রপাঠ দুঙ্গাকে বিদায় করে দেওয়া হয়। নতুন কোচ মানো মেনেজেসের প্রথম কাজই ছিল নেইমারকে আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের জন্য নেইমারকে ডাকা। ১০ আগস্ট ২০১০ মেটলাইফ স্টেডিয়ামে সেই ম্যাচটায় শুরু থেকেই নেইমার খেললেন, গোলও করলেন।

সেই যে শুরু, তারপর থেকে তাঁকে ঘিরে প্রত্যাশার পারদ দিনকে দিনে শুধুই চড়েছে। কিন্তু এক যুগ পরে এখন যদি নেইমারের ক্যারিয়ারের দিকে ফিরে তাকাতে হয়, সেখানে উত্তরের চেয়ে প্রশ্ন বেশি চোখে পড়বে।

এ সময়ে দুটি বিশ্বকাপ খেলেছেন, তিনটি কোপা, একটা কনফেডারেশন কাপ, দুটি অলিম্পিক। জিতেছেন শুধু একটা করে অলিম্পিক সোনা ও কনফেডারেশন কাপ, ব্রাজিলের ট্রফি-কেসে যেগুলোর মূল্য আসলে খুব সামান্যই। পেলের সঙ্গে তুলনা নিয়ে যাঁর ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল, এই ৩১ ছুঁই ছুঁই বয়সে এসে তিনি দেখছেন, পেলের কাছাকাছি আছেন শুধু দেশের হয়ে গোলের সংখ্যায়। সেখানেও প্রশ্ন আছে। ৯২ ম্যাচে পেলের ৭৭ গোল ব্রাজিলকে তিনটি বিশ্বকাপ দিয়েছে, কিন্তু ১২১ ম্যাচে নেইমারের ৭৫ গোল? ৩১ বছর বয়সে ব্রাজিলকে সব দিয়ে এবং নিজে সব পেয়ে পেলে জাতীয় দলের জার্সিটা তুলে রেখেছিলেন। সেই বয়সে আরও একটা বিশ্বকাপের সামনে দাঁড়িয়ে নেইমার দেখছেন, তাঁর এখনো কিছুই দেওয়া হয়নি ব্রাজিলকে, পাওয়া হয়নি কিছুই।

উল্টো তিনি মাঠে নিজের আচরণের কারণে কখনো কখনো ব্রাজিল সমর্থকদেরও বিরক্তির কারণ হয়েছেন, মাঠের বাইরের আচরণ দিয়ে হয়েছেন নেতিবাচক খবরের শিরোনাম। এই বিশ্বকাপেই হয়তো তিনি গোলসংখ্যায় পেলেকে ছাড়িয়ে যাবেন। কিন্তু নেইমার নিজেও জানেন, শুধুই ব্রাজিলের হয়ে সবচেয়ে বেশি গোলের মালিক হয়ে কাতার থেকে ফিরে গেলে তিনি ব্রাজিলিয়ান ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এক আক্ষেপের নাম হয়েই থাকবেন।

সেটা জানেন বলেই, ফ্যাশন সাময়িকী জিকিউর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে কিছুদিন আগে নিজের স্বপ্নের কথা শোনাতে গিয়ে বলেছেন, ‘তিনটি স্বপ্ন এখনো পূরণ হয়নি আমার। আমি সেই স্বপ্নগুলোর পেছনে ছুটছি। এক. ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপ জেতা। দুই. পিএসজির হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগসহ সব ট্রফি জেতা। তিন. আরও অন্তত দুটো বাচ্চার বাবা হওয়া, কারণ আমি চাই না আমার ছেলে দাভি একা বড় হোক। আমি ওকে আরও ভাইবোন দিতে চাই।’

তিন নম্বরটা খুব কঠিন হওয়ার কথা না। দুই নম্বর স্বপ্নটা পূরণ না হলেও ক্ষতি নেই। বার্সেলোনার হয়ে তিনি চ্যাম্পিয়নস লিগসহ সবই জিতেছেন। কিন্তু এক নম্বর স্বপ্নটা সত্যি না হলে যে নেইমারের গল্পটাই সম্পূর্ণ হবে না। কাতার বিশ্বকাপই কি সেই স্বপ্নপূরণের মঞ্চ?

ভয়েস/জেইউ।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020
Design & Developed BY jmitsolution.com