শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:৩৪ অপরাহ্ন

দৃষ্টি দিন:
সম্মানিত পাঠক, আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। প্রতিমুহূর্তের সংবাদ জানতে ভিজিট করুন -www.coxsbazarvoice.com, আর নতুন নতুন ভিডিও পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল Cox's Bazar Voice. ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন এবং কমেন্ট করুন। ধন্যবাদ।

চে গুয়েভারা, আলবেয়ার কামু ও ফুটবল

চিররঞ্জন সরকার:

ফুটবল নিয়ে যে কেবল সাধারণ মানুষজনই মাথা ঘামায়, সাধারণেরাই ফুটবল খেলার চেষ্টা করে, তা কিন্তু নয়। জগতে অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি আছেন, যারা ফুটবল ভালোবেসেছেন। ফুটবল খেলেছেন। এ প্রসঙ্গে প্রথম আলোচিত নামটি হচ্ছে চে গুয়েভারা। চে গুয়েভারার নাম শুনলেই আমাদের চোখে ভাসে একজন রোমান্টিক-বিপ্লবীর অবয়ব। ১৯৬৭ সালে তাকে হত্যা করা হয়, কিন্তু দশকের পর দশকজুড়ে চে হয়ে রয়েছেন তারুণ্যের প্রতীক। যে তরুণ স্বপ্ন দেখে, যে তরুণ সবার জন্য সমান একটি পৃথিবীকে আলিঙ্গন করতে চায়, তার সবচেয়ে বড় অবলম্বন চে। প্রকৃত নাম এর্নেস্তো রাফায়েল গুয়েভারা দে লা সের্না। তবে, শুধু ‘চে’ নামেই তাকে চেনে গোটা দুনিয়া। আর্জেন্টিনার মানুষ। ছিলেন ডাক্তার। ভালোবাসতেন কবিতা শুনতে ও লিখতে। তিনি একই সঙ্গে ডাক্তার, লেখক, ভ্রমণপিপাসু, রাগবি, ফুটবল, দাবা খেলার ভক্ত, এবং বিপ্লবী। ছাত্রাবস্থায় মোটরসাইকেলে লাতিন আমেরিকা ভ্রমণকালে সেখানকার দারিদ্র্য তাকে ভীষণভাবে নাড়িয়ে দেয়। তার তরুণ মন এর জন্য একচেটিয়া পুঁজিবাদকে দায়ী করে।

সমাজতান্ত্রিক ভাবধারায় বিশ্বাসী চে এরপর গুয়েতেমালায় সামাজিক সংস্কার আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। তারপর ফিদেল ক্যাস্ত্রোর সংস্পর্শে এসে কিউবার বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ দেন। কিউবার অত্যাচারী বাতিস্তা সরকারের সঙ্গে প্রায় দু’বছরের সংগ্রামের পর সেই সরকারের পতন হয়। ১৯৬১ সালে ফিদেল ক্যাস্ত্রো চে গুয়েভারাকে শিল্পমন্ত্রী করেন। কিউবার রাষ্ট্রদূত হিসেবে বিভিন্ন দেশে যান। ১৯৬৫ সালে ক্যাস্ত্রো জানান, কিউবা ছেড়েছেন চে। ক্ষমতার আস্ফালন দেখানোর ব্যাপারে পুঁজিবাদী আমেরিকা বা সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া, চীন সবারই নীতি এক। রাজনৈতিক দলমতনির্বিশেষে ক্ষমতা ছাড়তে সবারই আপত্তি সমান। এইখানেই চে স্বতন্ত্র। ১৯৬৫ সালে কিউবা ত্যাগ করে তিনি আফ্রিকার কঙ্গোয় যান বিপ্লব সংগঠনের উদ্দেশ্যে। তারপর বলিভিয়া। সিআইএর সাহায্যপুষ্ট বলিভিয়ার সেনার হাতে চে বন্দি ও নিহত হন ১৯৬৭ সালে। সারা বিশ্বে বিপ্লবপিপাসুদের মহানায়ক চে গুয়েভারা যৌবনে ফুটবল খেলতেন, ফুটবল ভালোবাসতেন মনেপ্রাণে। ১৮ মে, ১৯৬৩। হাভানায় খেলতে আসা ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওর শহরতলির ছোট ক্লাব মাদুরিয়েরা স্পোর্তে’র শেষ ম্যাচ। খেলা দেখতে হাজির চে। তিনি তখন কিউবার শিল্পমন্ত্রী। ১৯৫৮’র সুইডেন, ১৯৬২’র চিলির বিশ্বকাপে পেলে, গারিঞ্চার ব্রাজিলকে নিয়ে তখন তুমুল উন্মাদনা। স্টেডিয়ামে না এসে পারেননি ‘কমানদান্তে’। স্টেডিয়ামে বসে দেখেন পুরো খেলা। মাদুরিয়েরা সেই ম্যাচ ৩-২ গোলে জেতে। খেলা শেষে চে খেলোয়াড়দের সঙ্গে মিলিত হন। শুভেচ্ছা জানান। আসলে চে নিজেও ছিলেন ফুটবল-পাগল। রাগবি খেললেও ছেলেবেলায় ফুটবলই ছিল ভালোবাসা।

গ্রামসির মতো ইনসাইড লেফট-ব্যাক নয়, চীন বিপ্লবের নায়ক মাওয়ের মতোই চে খেলতেন গোলকিপার পজিশনে, হাঁপানির কারণে সবসময় পকেটে থাকত ইনহেলার, বলেছেন তার অন্যতম জীবনীকার রিচার্ড হ্যারিস, ‘চে গুয়েভারা : এ বায়োগ্রাফি’ গ্রন্থে। মোটর সাইকেল ডায়ারিজে রয়েছে সেই বিবরণ। বন্ধু আলবার্তো গ্রানাদোর সঙ্গে আন্দিজ পার হয়ে চিলি হয়ে উত্তরে পেরুর মাচু পিচ্চুতে পৌঁছে ‘‘একটি দলের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল, ওরা তখন ফুটবল খেলছিল, আমরাও খেলার আমন্ত্রণ জোগাড় করে ফেললাম। বেশ কয়েকটা বিদ্যুৎগতিতে ট্যাকল করার পর আমি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে ওদের কাছে স্বীকার করি : আলবার্তোর সঙ্গে আমিও বুয়েনস আয়ার্সে প্রথম ডিভিশনে খেলেছি। আলবার্তো মাঝমাঠে তার কেরামতি দেখাল। মাঠটা এবড়ো খেবড়ো, যাকে স্থানীয় মানুষজন বলেন পামপা। অন্যদের তুলনায় আমাদের দু-জনের ভালো খেলা চোখে পড়ল বলের মালিকের। ঘটনাচক্রে তিনি আবার হোটেলের ম্যানেজারও বটে। অতএব, তিনি আমাদের তার ওখানে দিনকয়েক কাটানোর নেমন্তন্ন করে ফেললেন, যতদিন না বিশেষ রেলগাড়ি চড়ে আমেরিকানদের পরবর্তী দলটা এসে পড়ছে।’’

মাঠের মধ্যে বুলেটের বেগে ছুটতেন চে। দেখে আলবার্তো তার নাম দিয়েছিলেন ‘গুলি’। এই আলবার্তোই লক্ষ্য করলেন মাঠে আসার সময়, কিংবা বিশ্রামের সময় চে বই পড়েন। একদিন আবিষ্কার করলেন চে ফ্রয়েড পড়ছেন। প্রশ্ন করে জানলেন, ফরাসিতেই চে ভল্টেয়ার পড়ে ফেলেছেন। ফ্রয়েড থেকে জ্যাক লন্ডন, নেরুদা থেকে হোরাসিও কিরোগা, আনাতোল ফ্রাঁস, এমনকি কার্ল মার্কসের দাস ক্যাপিটালও বুঝে কিংবা না-বুঝে পড়ে ফেলেছেন। দার্শনিক, মার্কসবাদী তাত্ত্বিক আন্তোনিও গ্রামসির কাছে ‘‘ফুটবল হলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমাজের মডেল। ফুটবল চায় সৃজনশীলতা। ফুটবল মানে প্রতিযোগিতা, সংঘাত। কিন্তু এটি নিয়ন্ত্রিত হয় একটি শোভনসুন্দর খেলার অলিখিত নিয়মের দ্বারা।’’ ফুটবলচে’র কথায়, ‘‘এটি নিছক একটি সাধারণ খেলা নয়, এটি বিপ্লবের একটি হাতিয়ার।’’

শুধু গ্রামসি কিংবা চে নয়, ফুটবলের ভক্ত ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যিক আলবেয়ার কামু। ১৯১৩ সালের ৭ নভেম্বর আলজেরিয়ার মন্দোভিতে জন্মগ্রহণ করেন। ফরাসি বংশোদ্ভূত এই আলজেরীয় সাহিত্যিক ৪ জানুয়ারি, ১৯৬০ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় অকালে মৃত্যুবরণ করেন। ফরাসিদের শাসিত আলজেরিয়ার এক দরিদ্র পরিবারে কামুর জন্ম। মা ছিলেন নিরক্ষর, অংশত বধির। বাবা কৃষি খামারের মজুর, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রণাঙ্গনে যখন মারা যান, কামু তখন মায়ের কোলে। কামু হাইস্কুলেই পড়তে পারতেন না, যদি না প্রাইমারি স্কুলের সেই শিক্ষক তার মধ্যে থাকা মেধাকে খুঁজে না পেতেন, কিংবা তার দাদিকে স্কলারশিপের আবেদন করার জন্য না বোঝাতেন। হতদরিদ্র পরিবার থেকে আসা কামুর ফুটবলকে ভালোবাসার কারণ ছিল একটাই। ফুটবল মাঠের সহজ সাধারণ কাঠামো। যেখানে জাতি-ধর্ম-সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সবাইকে স্বাগত জানানো হয়। তার ভাষায় ‘‘আমি কতটা দরিদ্র ছিলাম, হাইস্কুল পর্যন্ত আমি তা জানতাম না। এরপরই আমি পার্থক্য করতে শিখি।’’

‘‘কামু গোলকিপার পজিশনে খেলতেন, কারণ ওই পজিশনে খেললে জুতোর ওপর কম চাপ পড়বে, ফুটোফাটা কম হবে। গরিব বাড়ির ছেলে কামুর পক্ষে ফুটবল মাঠে দৌড়ানোর মতো বিলাসিতা দেখানোর সুযোগ ছিল না। প্রতিদিন তার দাদি জুতোর শুকতলা পরীক্ষা করে দেখতেন, ফুটোফাটা দেখলেই মারধর করতেন।’’ বলেছেন লাতিন আমেরিকার রক্তাক্ত ইতিহাস ‘ওপেন ভেইনস অব লাতিন আমেরিকা’র লেখক এদুয়ার্দো গালেয়ানো। তার ‘সকার ইন দি সান অ্যান্ড শ্যাডো’ গ্রন্থে। আঠারো বছর বয়েসে যক্ষ্মা না হলে আলোড়নসৃষ্টিকারী উপন্যাস ‘আউটসাইডার’ হয়তো আমাদের কাছে অধরাই থেকে যেত। তবে সর্বকালের অন্যতম সেরা ফরাসি লেখক আলবেয়ার কামু নিশ্চিতভাবেই হতেন একজন পেশাদার ফুটবল খেলোয়াড়। খেলতেন গোলকিপার, যে পজিশনকে নিঃসঙ্গতা ও সংহতি দু’ভাবেই সংজ্ঞায়িত করা যায়, পরে যা প্রতিফলিত হয়েছে তার কাজে, রাজনৈতিক শিক্ষায়। ‘‘একজন মানুষের নৈতিকতা ও কর্তব্যবোধ সম্পর্কে আমি যতটুকু জেনেছি, তার জন্য আমি ফুটবলের কাছে ঋণী।’’

এক-নম্বর জার্সি পরে গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে কামু শিখেছিলেন তার জীবনদর্শন ‘‘আমি শিখেছিলাম, যখন তুমি আশা করছ এবারে বল আসছে, সে-সময় কখনোই তা আসে না, যে উপলব্ধি আমাকে জীবনের জন্য ভীষণভাবে সাহায্য করেছিল, বিশেষত বড় শহরগুলোতে থাকার সময়, যেখানে মানুষ সাধারণত যা দাবি করেন, সেদিকে আদৌ কখনো ঝোঁকেন না।’’ নোবেলজয়ী লেখকের কাছে ফুটবল ছিল প্রথম প্রেম। তার স্বপ্ন। প্রথমে স্কুল টিমের গোলকিপার। পরে যক্ষ্মায় আক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত রেসিং উনিভার্সিতেয়ার আলজেরোয়া (আরইউএ) জুনিয়র টিমের নিয়মিত কিপার। খেলেছিলেন উত্তর আফ্রিকান চাম্পিয়ন কাপ। ফুটবল ছিল তার স্বপ্ন। রোগশয্যা থেকে ফিরে আট বছর বাদে আবারও নামেন খেলার মাঠে। কিন্তু ফুসফুস তখন এতটাই ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছে, যে শরীর আর খেলার সুযোগ দেয়নি। ‘‘প্রথম অর্ধ শেষ হওয়ার আগেই আমার জিভ বেরিয়ে আসে সেই কুকুরদের মতো, গ্রীষ্মের দুপুরে যাদের সঙ্গে আমাদের মাঝেমধ্যেই দেখা হয়।’’ রেসিং উনিভার্সিতেয়ার একটি ক্রোড়পত্রেই রয়েছে নোবেলজয়ী লেখকের সেই অসাধারণ উদ্ধৃতি, ‘‘নৈতিকতা সম্পর্কে যে সামান্য কিছু আমি জেনেছি, তা শিখেছি ফুটবল মাঠে, নাটকের মঞ্চে। এগুলোই ছিল আমার প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয়।’’ তবে দুইয়ের মধ্যে বেশি পছন্দ অবশ্যই ফুটবল। বন্ধু শার্ল পঁসে একবার তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন ফুটবল নাকি নাটক, কোনটা বেশি পছন্দ করেন। নির্দ্বিধায় কামু জবাব দিয়েছিলেন : ‘‘ফুটবল, নিঃসন্দেহে ফুটবল।’’ কেন? কারণ, কামু বিশ্বাস করতেন সহজ নৈতিকতায়। মনে করতেন ট্র্যাডিশনাল রাজনীতি, ধর্মের নামে মানুষকে এক জটিল অনুশাসনে বেঁধে ফেলা হয়, যাতে শেষ পর্যন্ত সেই রাজনীতি বা ধর্মীয় মতবাদই লাভবান হয়। কামুর মতে ফুটবল মাঠের নৈতিকতা মেনে চলাই শ্রেষ্ঠ পন্থা।

ফুটবল মানে একটাই মাঠ। সবার জন্য সমান। একটাই বল। সবার জন্য সমান। খেলোয়াড়দের মধ্যে পার্থক্য করে দেয় শুধু পরিশ্রম আর প্রতিভা।

লেখক: লেখক ও কলামিস্ট

[email protected]

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020
Design & Developed BY jmitsolution.com