রবিবার, ১৪ অগাস্ট ২০২২, ০৭:১৯ অপরাহ্ন

দৃষ্টি দিন:
সম্মানিত পাঠক, আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। প্রতিমুহূর্তের সংবাদ জানতে ভিজিট করুন -www.coxsbazarvoice.com, আর নতুন নতুন ভিডিও পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল Cox's Bazar Voice. ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন এবং কমেন্ট করুন। ধন্যবাদ।

পদ্মা সেতু শেখ হাসিনা ও স্বাধীনতা

আহমেদ জাভেদ:

পদ্মা সেতুকে ৫০ বছর বয়সী বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতা ও স্ব-ক্ষমতার সম্প্রসারণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। একাত্তর সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষ যে পরম কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, ঠিক তেমনি জাতির জনকের সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন দর্শনের সর্বোচ্চ অর্জন হলো পদ্মা সেতু। পদ্মা সেতুকে শুধু ‘আরেকটি সেতু’ হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে সরে এসে ‘স্বাধীনতার’ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা যেতে পারে।

নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত অধ্যাপক অমর্ত্য সেন তার ‘ডেভেলপমেন্ট অ্যজ ফ্রিডম’ গ্রন্থে উন্নয়নকে বুঝতে এই নবতর দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির কথা সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। অধ্যাপক সেন উন্নয়নের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে মানুষের স্বাধীনতাভিত্তিক উন্নয়ন দর্শন তুলে ধরেন। ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম মূলমন্ত্র স্বাধীনতাকে তার দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রে স্থান দিয়েছেন। বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষাদর্শনের অন্যতম মূলমন্ত্র ছিল স্বাধীনতা ও যুক্তিশীলতা। তারই বিদ্যাপীঠ শান্তিনিকেতন থেকে অমর্ত্য সেন শিক্ষার হাতেখড়ি নিয়েছেন। অধ্যাপক সেনের জীবনের এই মৌলিক শিক্ষা একটি প্রশস্ততা দৃষ্টিকোণের সূচনা করে যেখানে সেন মানুষকে উন্নয়নের কেন্দ্রে স্থাপন করেন। অর্থশাস্ত্রের চিন্তাপদ্ধতিতে এর আগে মানুষ ও স্বাধীনতাকে কেন্দ্রে রেখে ভাবনাটি জোরালো ছিল না। বর্তমানেও মূলধারার অর্থশাস্ত্রে উন্নয়নকে মোট জাতীয় উৎপাদন (জিএনপি), ব্যক্তিগত আয় বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সমাজের আধুনিকায়ন ইত্যাদি বিষয়গুলো দিয়ে বিবেচনা করা হয়। উন্নয়নকে এসব সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে সমাজে বসবাসরত মানুষের স্বাধীনতা ও স্ব-ক্ষমতার পরিধি বিস্তৃত হওয়া অর্থে বোঝা যেতে পারে। তার মানে এই নয় যে, অর্থশাস্ত্রের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি অগুরুত্বপূর্ণ। সেগুলোর গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও আমরা এটি বলতে পারি যে, সমাজে মানুষকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতা ও স্ব-ক্ষমতার স্বাদ দিতে পারে উন্নয়নের এই নবতর দৃষ্টিভঙ্গি। এই গভীর ও তাৎপর্যময় দৃষ্টিকোণটি প্রণয়ন করেছেন বর্তমান সময়ের অগ্রগণ্য দার্শনিক ও অর্থশাস্ত্রী অমর্ত্য সেন।

বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা বাস্তবায়িত হতে দেয়নি খুনিরা। বর্তমানে সেই অপূর্ণ স্বপ্নের বাস্তবায়নে বঙ্গ বন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার পিতার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের কাজটি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তিনটি মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি রাজনীতির পরিসরকে অধিকতর সমৃদ্ধ করেছে। প্রথমত, তিনি রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য নবতর উন্নয়ন দর্শন নির্মাণ করেছেন, যার ভেতর ডিজিটাল বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত। এই উন্নয়ন দর্শনের মূলে রয়েছে দুটি বিষয় : প্রথমটি হলো দৈনন্দিন বাস্তব জীবনে মানুষকে প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ দেওয়ার ব্যবস্থা করা ও দ্বিতীয়টি হলো বঙ্গবন্ধুর আজীবনের স্বপ্ন সোনার বাংলার ভাবধারাকে নতুন সময়ের প্রেক্ষাপটে পুনরুজ্জীবিত করে উন্নয়ন দর্শন নির্মাণ করা। শেখ হাসিনার এই উন্নয়ন দর্শন দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশকে নতুনভাবে অনুপ্রাণিত করেছে ও এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশকে সামাজিক সূচকে নেতৃত্বের আসন দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, শেখ হাসিনার নেতৃত্বের ধরন ব্যতিক্রমী, কারণ, তিনি একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতা ও জনবুদ্ধিজীবী। নাগরিক সমাজের সব সমালোচনার চিন্তা ও দর্শনগত মোকাবিলা তিনি দীর্ঘ অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান দ্বারা মোকাবিলা করেন জনপরিসরে দাঁড়িয়েই। এই বৈশিষ্ট্যটিও দক্ষিণ এশিয়ার অন্য রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে খুব সুলভ নয়। তৃতীয়ত. শেখ হাসিনা প্রচলিত উন্নয়ন-সাহিত্য ও দর্শনে বাদ পড়াদের গুরুত্বপূর্ণ স্থান দিয়েছেন। বিশেষ করে উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দিয়েছেন নারীকে। ফলে ভারতসহ অন্যান্য দেশের তুলনায় নারীর কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণে ও নারী-পুরুষের অসমতা হ্রাসে বাংলাদেশ অনেক অগ্রসর অবস্থানে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, তিনি নারীর বাধা দূরীকরণে প্রযুক্তিকে নারীদের কাছে সহজলভ্য করেছেন ও সফল প্রয়োগ করেছেন। নারীদের অগ্রযাত্রায় আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বাংলাদেশি এনজিওগুলো জোরালো ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু তিনি এনজিওগুলোর সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি না করে তাদের সক্ষমতা ও আন্তরিকতা কাজে লাগিয়েছেন। অধ্যাপক অমর্ত্য সেন বাংলার পাঠশালা ফাউন্ডেশন আয়োজিত সেমিনারে বলেছেন, ‘বাংলাদেশের উন্নয়নের বড় একটি দিক হলো, এ দেশের সরকারের সঙ্গে এনজিওগুলো খুব সাবলীলভাবে কাজ করেছে। ব্র্যাক, গ্রামীণ ব্যাংকের কথা উল্লেখ করতে হয় বিশেষভাবে, বাংলাদেশের উন্নয়নে এদের ভূমিকা অসাধারণ। সব দেশে কিন্তু এনজিওগুলো এভাবে কাজ করতে পারেনি।’

নয় মার্চ দুই হাজার বিশ তারিখে ঢাকায় অধ্যাপক অমর্ত্য সেনের উল্লিখিত বক্তৃতায় তিনি বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার আরও একটি কারণের কথা উল্লেখ করেন। তার ভাষায় : ‘বাংলাদেশ সরকারের আরেকটি পরিকল্পনা বড় পরিবর্তনের সূচনা করেছে, সেটা হলো সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন। মনে পড়ে, একসময় আমাদের মানিকগঞ্জের [দাদা]বাড়ি থেকে মামাবাড়ি বিক্রমপুরে যেতে দেড়-দুদিন সময় লেগে যেত, এখন সেখানে লাগে কয়েক ঘণ্টা। এটি একটা বড় ব্যাপার। মানুষে মানুষে যোগাযোগ অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা পালন করে। অ্যাডাম স্মিথ এ নিয়ে গবেষণা করেছেন। ব্যাপারটা হলো, বাংলাদেশের এ উন্নয়নের পেছনে সরকারের সুচিন্তিত পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সেটা আবার সব জায়গায় এভাবে হয়নি। ভারতে হয়নি, পাকিস্তানে হয়নি। আবার বাংলাদেশ যত দিন পূর্ব পাকিস্তান ছিল, তত দিনও কেন হলো না এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা দরকার।’

বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তীতে পদ্মা সেতু হলো যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির সবচেয়ে বড় স্মারক। উদাহরণস্বরূপ, বর্তমানে ঢাকা থেকে বরিশাল বিভাগে যাতায়াতে প্রায় দশ ঘণ্টা সময় লাগে। পঁচিশে জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের পর সর্বসাধারণের জন্য সেতুটি খুলে দিলে ঢাকা-বরিশালের যোগাযোগ চার ঘণ্টায় নেমে আসবে। এক হিসাবে দেখা যায় শুধু পদ্মা সেতু আমাদের অর্থনীতিতে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) এক শতাংশের বেশি যোগ করবে। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতিতে এ দেশের মানুষের স্বাধীনতার বড় রকমের সম্প্রসারণ ঘটাচ্ছে এই পদ্মা সেতু।

অধ্যাপক অমর্ত্য সেন তার আত্মজীবনী ‘হোম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড : আ মেমোয়ার’ (স্মৃতিকথা : ঘরে-বাইরে) গ্রন্থে বাংলার নদ-নদীবিষয়ক আলোচনায় পদ্মা নদীর ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়ে খুব মনোজ্ঞ এক আলোচনার সূত্রপাত করেছেন। তার ভাষায় :‘পূর্ব বাংলার অভ্যন্তরে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ব্যবসায়-বাণিজ্যের জন্য যোগাযোগ বেশ দুরূহ ছিল। এর প্রধান কারণ ছিল নৌপথে পণ্য পরিবহনের জন্য যোগাযোগব্যবস্থাটি তখন পর্যন্ত ছিল সমস্যা-সংকুল। কিছু তথ্য-প্রমাণ সাক্ষ্য দেয় যে, নদীপথে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির সম্ভাবনা বেড়ে গিয়েছিল, ফলে কোম্পানিগুলোও ব্যবসায় ও বাণিজ্যের সম্ভাবনার নতুন আশা দেখছিল।’ ষোড়শ শতকের শেষ ভাগে একটি ভূমিকম্পের ফলে পদ্মানদী বৃহৎ প্রমত্তা নদী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল। অমর্ত্য সেন আরও বলছেন, ‘গঙ্গার সঙ্গে পদ্মার দূরত্ব ঘুচে সরাসরি সংযোগ প্রতিষ্ঠা… বিপুল পরিমাণ জলরাশি পূর্ববঙ্গে তথা এখনকার বাংলাদেশে প্রবাহিত করল।… এই পরিবর্তনের ফলে তাৎক্ষণিকভাবেই পূর্ববঙ্গের অর্থনীতি বিপুলভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে। কারণ, নদীপথে সংযোগের এই সুবিধা পূর্ববঙ্গকে সমগ্র উপমহাদেশের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুবিধার পাশাপাশি বিশ্ববাজারের সঙ্গে যোগাযোগে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। বাকি বিশ্বের সঙ্গে নদীপথে যোগাযোগের এই সুবিধার ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাবের পাশাপাশি পূর্ববঙ্গেরই অভ্যন্তরে আর্থিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটে। পূর্ববঙ্গের আর্থিক সমৃদ্ধির বড় প্রমাণ পাওয়া যায় সপ্তদশ শতকে মুঘল শাসকদের সরকারি আয় খুব দ্রুততার সঙ্গে বাড়িয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার অল্প সময়ের ভেতরেই পূর্ণ করা সম্ভব হয়েছিল। মুঘল সম্রাটদের কর-ব্যবস্থা থেকে আয় সবচেয়ে দ্রুত হয়েছিল এই পূর্ববঙ্গ থেকেই।’

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ল্যামন্ট ইউনিভার্সিটি প্রফেসর অমর্ত্য সেন উন্নয়নকে স্বাধীনতা ও স্ব-ক্ষমতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলতে গিয়ে মানুষের অ-স্বাধীনতাগুলোকে সরানোর কথা বলেছেন। মানুষের অ-স্বাধীনতাগুলোর মধ্যে রয়েছে দারিদ্র্য, আর্থিক সম্ভাবনার পথ সংকুচিত হওয়া, শোষণ ও সামাজিক বঞ্চনা, জনপরিষেবার বেহাল দশা ও সেগুলোর প্রতি দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধিদের অবজ্ঞা ও অবহেলা, জনসাধারণের ওপর রাষ্ট্রের নিপীড়ন, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ইত্যাদি। এই পৃথিবীতে প্রাচুর্য ও সম্পদের অকল্পনীয় বৃদ্ধি সত্ত্বেও একটি বৃহৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতার দাবিকে ক্রমাগতভাবে অস্বীকার করা হচ্ছে। ক্ষুধা, অপুষ্টি, আশ্রয়হীনতা, বিশুদ্ধ পানির অভাব, আর্থিক দারিদ্র্য ইত্যাদি মানুষের স্বাধীনতাকে কেড়ে নেয়। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি মানুষের এসব অ-স্বাধীনতার শক্ত বাঁধন আলগা করতে সাহায্য করে। উন্নয়ন শুধু বৈষয়িক সচ্ছলতাই নয়, এটি শান্তি ও সমৃদ্ধিও বাড়িয়ে তোলার শক্তিশালী দর্শন।

লেখক : বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। সভাপতি, বাংলার পাঠশালা ফাউন্ডেশন

[email protected]

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020
Design & Developed BY jmitsolution.com