শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, ০৪:১৭ পূর্বাহ্ন

দৃষ্টি দিন:
সম্মানিত পাঠক, আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। প্রতিমুহূর্তের সংবাদ জানতে ভিজিট করুন -www.coxsbazarvoice.com, আর নতুন নতুন ভিডিও পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল Cox's Bazar Voice. ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন এবং কমেন্ট করুন। ধন্যবাদ।

সমুদ্র ভাঙন রোধে কেয়াগাছ রোপণের পরামর্শ বিজ্ঞানীদের

আবদুল আজিজ:
সমুদ্রের ভাঙন রোধে কেয়াগাছ, নিসিন্ধাসহ সামুদ্রিক উদ্ভিত প্রকৃতির গাছ রোপণের পরামর্শ দিয়েছেন সমুদ্র বিজ্ঞানীরা। একারণে সমুদ্রপাড়ে প্রাকৃতিকভাবে ডেইল তেরী হবে এবং সৌন্দর্য্য বর্ধিত ঝাউগাছ রক্ষার পাশাপাশি হারানো জীববৈচিত্র পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের রঙ তোলে ধরবে সমুদ্র।

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার। মনুষ্যত্ব অত্যচার ও জলবায়ু পরিবর্তন জনিত কারণে ভাঙছে সমুদ্রের পাড়। ১২০ কিলোমিটার সমুদ্রের অধিকাংশ এলাকা এখন ভাঙণের কবলে। এতে করে পর্যটকদের কাছে সৌন্দর্য্য হারাচ্ছে এই সমুদ্র সৈকত। ইতিমধ্যে কক্সবাজার সৈকতের লাবণী, সুগন্ধা, কলাতলী, কবিতা সত্বর সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ঢেউয়ের তোড়ে ভেঙ্গে গেছে। তাই, সমুদ্র সৈকতের ভাঙ্গণ প্রতিরোধে দীর্ঘ গবেষণার মাধ্যমে উপায় বের করেছে সমুদ্র বিজ্ঞানিরা।

বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক ইনস্টিটিউটের মহা পরিচালক ও সমুদ্র বিজ্ঞানী সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দর কক্সবাজার ভয়েসকে বলেন, সমুদ্র ভাঙণরোধে একটি অসাধারণ গাছ হচ্ছে কেয়া। সাগরের ভাঙণরোধ ও ঝাউগাছ রক্ষা করতে কেয়াগাছের বিকল্প নেই। কেয়াগাছের পাশাপাশি নিসিন্ধা, নেন্টেনা সহ সামুদ্রিক উদ্ভিত গাছ সাগরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। গড়ে উঠে প্রাকৃতিকভাবে বালুর ডেইল। এই বালুর ডেইল সমুদ্রপাড়ের বেড়িবাঁধ তৈরী করে। এতে করে সমুদ্রের আকার বড় হবে, ফিরে আসবে জীববৈচিত্র।

সমুদ্রভাঙণ রোধে ঝাউগাছ কোন কাজে আসছে উল্লেখ করে সমুদ্র বিজ্ঞানী সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দর কক্সবাজার ভয়েসকে বলেন, ‘সমুদ্রপাড়ে ঝাউগাছ সৌন্দর্য্য বহন করলেও ভাঙণরোধে কোন কাজে আসছে না। কারণ, ঝাউগাছ সমুদ্রপাড়ের বালি ধরে রাখতে পারে না। এতে করে জোয়ারের পানি যখন প্রবেশ করে সাথে সাথে ঝাউগাছ হেলে পড়ে যায়। তাই এই নান্দনিক গাছকে রক্ষা করতে হলে ঝাউবাগানের সামনে বালিয়াড়িতে প্রাকৃতিকভাবে ডেইল তৈরী করতে হবে।’

সৈকতের ভাঙণরোধে ‘জিও ব্যাগ’ নয়, প্রাকৃতিকভাবে প্রতিরোধ করার কথা জানিয়ে এই সমুদ্র বিজ্ঞানী বলেন, ‘সমুদ্রের যে প্রচন্ড ঢেউ আসে তা যেন সমুদ্রেই নষ্ট করে দেয়া সে ব্যবস্থা করতে হবে। ঢেউ যাতে প্রচন্ড গতি নিয়ে আচড়ে পড়তে না পারে যেজন্য উন্নত দেশের মত আমাদের সমুদ্রেও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। এজন্য আরও বেশী গবেষণা করা যেতে পারে।’

এদিকে সমুদ্র ভাঙণরোধসহ নানা বিষয়ে সমুদ্র বিজ্ঞানীরা একের পর এক গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। সমুদ্রের পাড় ও উপকূলীয় এলাকা সমুহে কেয়াবন সৃষ্টি করলে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে। কারণ, কেয়া গাছ সমুদ্রের বালির বন্ধন তৈরি, মাটির ক্ষয়রোধ ও সামুদ্রিক বাতাসের তীব্র প্রবাহ ঠেকাতে ভূমিকা রাখে। এ কারণে উপকূলীয় অঞ্চল সুরক্ষায় কেয়াগাছের গুরুত¦ পরিবেশ বিজ্ঞানে অপরিসীম। এই কেয়াগাছের বনই ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কবল থেকে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপটির জনবসতি রক্ষা করে চলেছে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। সেন্টমার্টিন দ্বীপের বাসিন্দারাও এটা মনে করেন। এছাড়াও কেয়াগাছের রয়েছে অত্যন্ত মূল্যবান পুষ্টি ও ঔষধিগুণ। সাম্প্রতিককালে এর ঔষধিগুণ কাজে লাগিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তৈরি করা হচ্ছে দুরারোগ্য মৃগীরোগ, ক্যান্সার, ডায়াবেটিসসহ অন্তত ১৬টি রোগের প্রতিষেধক। তাই সংরক্ষণের পাশাপাশি দেশের ব্লুু-ইকোনমি তথা সমুদ্র সম্পর্কিত অর্থনীতিতেও কেয়াগাছ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।

সেন্টমার্টিনের দক্ষিণপাড়ার ষাটোর্ধ রশীদ মিয়া মনে করেন, যুগযুগ থরে দ্বীপের বাসিন্দারা ঘরের ছাউনি হিসাবে কেয়াগাছের পাতা, দড়ি হিসাবে এর শেকড় এবং খুঁটি ও অন্যান্য কাজে এর কান্ড ব্যবহার করত। কিন্তু গত প্রায় তিন দশকে এ দ্বীপে পর্যটন শিল্পের বিকাশের কারণে কেয়াগাছের ব্যবহার অনেকাংশেই কমে গেছে। শিশুরা কৌতূহলবশত কেয়া ফলের শ্বাস খেলেও বর্তমানে এর কোনো বাজারমূল্য নেই। দ্বীপের বাসিন্দারা কেবল অবিচল সামুদ্রিক বায়ু ঠেকাতে ও সামুদ্রিক জোয়ার থেকে মাটির ক্ষয়রোধে কেয়া বনের ব্যবহার করছে।

একই এলাকার সামশুল আলম কক্সবাজার ভয়েসকে জানান, কেয়া সমুদ্র উপকূলে ভেসে আসা আলগা বালির বন্ধন তৈরি, মাটির ক্ষয়রোধ ও বাতাস বিরতি হিসাবে কাজ করে। উচ্চ লবণাক্ততা ও খরা এবং জলাবদ্ধতা সহনশীল কেয়াগাছ তীব্র লবণযুক্ত বাতাসের ঝাপটা ও বালির বিস্ফোরণেও টিকে থাকে। উচ্চ মাত্রার সৌর বিকিরণের জন্যও কেয়াগাছ সহনশীল।

কেয়া গাছ নিয়ে সমুদ্র বিজ্ঞানীদের গবেষণা:
কেয়া গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। এর মধ্যে প্যান্ডানাস টেকটরিয়াস লম্বায় ৩ থেকে ৪ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এ গাছের কান্ড গোলাকার ও কাঁটাযুক্ত। কান্ড থেকে শাখা-প্রশাখা বের হয়। গাছগুলো প্রায় বাঁকা হয়। গাছের নিচে থেকে মোটা শাখা পর্যন্ত বেশ কিছু মূল বের হয়ে মাটিতে ভিত্তি তৈরি করে। এগুলোকে ঠেসমূল বলা হয়। এই মূল গাছের কান্ডকে দৃঢ়ভাবে মাটির সঙ্গে যুক্ত করে এবং গাছের ভার বহনে সহায়তা করে। পাতা পাঁচ থেকে সাত ফুট লম্বা, দুই থেকে তিন ইঞ্চি চওড়া, পাতার কিনারা করাতের মতো খাঁজ কাটা হয়। দেখতে অনেকটা আনারসের পাতার মতো। আশ্বিন-কার্তিক মাসে কেয়াগাছে আনারসের মতো ফল হয়। লম্বায় সাত থেকে আট ইঞ্চি আকারের ফল দেখতে কমলা, পীত বা ধূসর রঙের মতো। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে কেয়া ফুল দেয়। একে তাই বর্ষার ফুলই বলা হয়। ফুল সাদা ও সুগন্ধীযুক্ত। স্ত্রী পুষ্পগুলো পুংপুষ্পের তুলনায় আকারে ছোট হলেও সুগন্ধ বেশি। ফুলে মধু না থাকলেও ভ্রমর বসে। প্রাচীনকাল থেকেই কেয়া ফুলের সুগন্ধ এবং ভেষজ গুণের কথা সুবিদিত হলেও মেধাস্বত্ব বা ঐতিহ্যগত জ্ঞান হারিয়ে যেতে বসেছে। প্রাচীন সাহিত্যেও লিপিবদ্ধ আছে কেয়ার কথা।

ভয়েস/আআ

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020
Design & Developed BY jmitsolution.com